বাচ্চার জ্বর হলে করণীয়: কখন বাড়িতে, কখন ডাক্তার
বাচ্চার জ্বর হলে বাড়িতে কী করবেন, কোন ওষুধ দেবেন না, আর কোন লক্ষণ দেখলে দেরি না করে ডাক্তার বা হাসপাতালে যাবেন। Baby fever: what to do.
এক নজরে
- জ্বর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, তবে এক মাসের কম বয়সী শিশুর জ্বর মারাত্মক সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে।
- ২ মাসের কম বয়সী শিশুর বগলে মাপা তাপমাত্রা ৩৭.৫° সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে দেরি না করে ডাক্তার দেখান।
- বাড়িতে কুসুম গরম পানিতে গা মুছে দিন, হালকা জামা পরান, ঘন ঘন বুকের দুধ দিন; ৬ মাসের কম হলে পানি নয়, বড় বাচ্চাকে বেশি তরল দিন।
- জ্বরের ওষুধ শুধু ডাক্তার বললে দিন; কোনো শিশুকেই অ্যাসপিরিন দেবেন না।
- বাচ্চা পান করতে না পারলে, সব বমি করে ফেললে, খিঁচুনি হলে বা নিস্তেজ হয়ে পড়লে এখনই হাসপাতালে যান।
জ্বর সবারই হয়। ইউনিসেফ বলছে, শরীরে জীবাণু ঢুকলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখায়, জ্বর তারই অংশ। কিন্তু নবজাতকের, বিশেষ করে এক মাসের কম বয়সী শিশুর জ্বর মারাত্মক সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে। তাই বাচ্চার জ্বর হলে করণীয় (অনেকে যেটা খোঁজেন “baby jor hole koronio” লিখে) কী, অর্থাৎ বাড়িতে যত্ন নেবেন, না দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যাবেন, তা ঠিক করে দেয় বাচ্চার বয়স আর জ্বরের সঙ্গে অন্য কী লক্ষণ আছে।
নবজাতকের জ্বর: অপেক্ষা নয়
- WHO-র প্রসব-পরবর্তী যত্নের নির্দেশিকায় নবজাতকের শরীরের তাপমাত্রা ৩৭.৫° সেলসিয়াস বা তার বেশি হওয়াকে বিপদ চিহ্ন ধরা হয়েছে। WHO-র শিশু-স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্দেশিকাও (IMCI) ২ মাসের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে ৩৭.৫° সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রাকে খুব গুরুতর অসুখের লক্ষণ ধরে, আর জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে পাঠাতে বলে। এই মাপ বগলে থার্মোমিটার রেখে মাপা তাপমাত্রার জন্য; তাই থার্মোমিটার দিয়ে বগলে মাপুন।
- ইউনিসেফ জানায়, ছোট শিশুর জ্বরের লক্ষণ খুব হালকাও হতে পারে: শিশু খুব খিটখিটে, স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বা অনেক কম ঘুমাচ্ছে, বা খেতে চাইছে না।
- এমন হলে বাড়িতে অপেক্ষা না করে ডাক্তার দেখান। নবজাতকের অন্য বিপদ চিহ্নগুলো দেখুন: নবজাতকের বিপদ চিহ্ন।
- নবজাতককে জীবাণু থেকে দূরে রাখুন। ইউনিসেফের পরামর্শ: কেউ অসুস্থ থাকলে সেরে না ওঠা পর্যন্ত নবজাতককে কোলে নেবেন না, চুমু দেবেন না।
বাচ্চার জ্বর হলে করণীয়: বাড়িতে যত্ন
জরুরি কোনো লক্ষণ না থাকলে ইউনিসেফের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতে বাচ্চাকে আরাম দিতে পারেন:
- কুসুম গরম পানিতে গোসল করান, বা কুসুম গরম পানিতে ভেজানো কাপড় দিয়ে গা মুছে দিন। পানি যেন বেশি ঠান্ডা না হয়, যাতে বাচ্চা কেঁপে না ওঠে।
- ঘরের ও বাইরের তাপমাত্রা বুঝে হালকা জামা পরান। গরমে ঘামাচি আর অতিরিক্ত গরম নিয়ে: বাচ্চার ঘামাচি।
- বাচ্চার শরীরে যেন পানির ঘাটতি না হয়, সেটা সবচেয়ে জরুরি। বুকের দুধ খাওয়া বাচ্চাকে আরও ঘন ঘন ও বেশি সময় ধরে বুকের দুধ দিন। ছয় মাসের বেশি বয়সী বাচ্চাকে এর পাশাপাশি বেশি করে তরল দিন, যেমন স্যুপ, ভাতের মাড় বা পরিষ্কার পানি।
- ৬ মাসের কম বয়সী বাচ্চাকে পানি বা অন্য কিছু দেবেন না, শুধু বুকের দুধ। ৬ মাস বা তার বেশি বয়সী বাচ্চার খাবার বন্ধ করবেন না। অসুখের সময় কীভাবে খাওয়াবেন, দেখুন: ছয় মাস পর বাচ্চার পরিপূরক খাবার শুরু।
ওষুধ নিয়ে সাবধান
- জ্বর কমানোর ওষুধ শুধু ডাক্তার বললে, আর ঠিক যেভাবে বলেছেন সেভাবে দিন।
- কোনো শিশুকেই অ্যাসপিরিন দেবেন না। ইউনিসেফ বলছে, এটা শিশুদের জন্য নিরাপদ নয়।
- ভেষজ বা টোটকা ওষুধও শিশুদের জন্য সাধারণত পরীক্ষিত বা নিরাপদ নয়।
- ডেঙ্গুর সময় কিছু ব্যথার ওষুধে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ে। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে কী দেবেন না, পড়ুন বাচ্চার ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ: বিপদচিহ্ন ও করণীয়।
সব কিছু করার পরও যদি মন বলে “কিছু একটা ঠিক নেই”, ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। পরামর্শের জন্য স্বাস্থ্য বাতায়নে ১৬২৬৩ নম্বরে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ফোন করা যায়।
কখন দেরি না করে হাসপাতালে যাবেন
WHO-র IMCI নির্দেশিকা অনুযায়ী ২ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুর এই সাধারণ বিপদ চিহ্নগুলোর যেকোনো একটি থাকলে তাকে জরুরি চিকিৎসা দিতে হয়:
- কিছু পান করতে বা বুকের দুধ খেতে পারছে না।
- যা খায়, সব বমি করে ফেলছে।
- এই অসুখে খিঁচুনি হয়েছে, বা এখন খিঁচুনি হচ্ছে।
- নিস্তেজ বা অচেতন হয়ে পড়ছে।
জ্বরের সঙ্গে ঘাড় শক্ত হয়ে গেলেও IMCI এটাকে খুব মারাত্মক জ্বরের অসুখ ধরে, আর জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে পাঠাতে বলে। এর যেকোনোটি দেখলে এখনই রওনা দিন। জরুরি নম্বর আর পথে কী করবেন: জরুরি অবস্থা।
জরুরি না হলেও কখন ডাক্তার দেখাবেন
- জ্বর না কমলে: IMCI অনুযায়ী জ্বর না কমলে ২ থেকে ৩ দিন পরে আবার স্বাস্থ্যকর্মীকে দেখাতে হয়। প্রতিদিন জ্বর ৭ দিনের বেশি থাকলে আরও পরীক্ষার জন্য ডাক্তারের কাছে পাঠানো হয়।
- শ্বাস দ্রুত হলে: শিশু শান্ত থাকা অবস্থায় পুরো এক মিনিট শ্বাস গুনুন। ২ মাস থেকে ১২ মাসের কম: মিনিটে ৫০ বা বেশি; ১২ মাস থেকে ৫ বছর: মিনিটে ৪০ বা বেশি হলে সেটা দ্রুত শ্বাস। শ্বাস নেওয়ার সময় বুকের নিচের অংশ ভেতরে দেবে গেলে, বা শ্বাসকষ্ট হলে, সেদিনই ডাক্তার দেখান।
- পাতলা পায়খানা থাকলে: পায়খানায় রক্ত গেলে বা বাচ্চা কম পান করলে তখনই যান। দেখুন: বাচ্চার পাতলা পায়খানা হলে করণীয়: ওআরএস ও জিংক।
- জ্বরের সঙ্গে সারা গায়ে র্যাশ আর কাশি, সর্দি বা চোখ লাল থাকলে IMCI-তে হামের লক্ষণ দেখতে বলা হয়েছে। পড়ুন: হামের লক্ষণ: বাচ্চার যত্ন ও এমআর টিকা।
- ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি: ম্যালেরিয়া হয় এমন এলাকায় থাকলে বা সেখান থেকে ঘুরে এলে ডাক্তারকে জানান; IMCI নির্দেশিকায় এমন ক্ষেত্রে ম্যালেরিয়া পরীক্ষার কথা বলা আছে।
- বাচ্চা আরও অসুস্থ হয়ে পড়লে, যেকোনো সময়।
বাচ্চার অন্য অসুখে কী করবেন, তা পাবেন বাচ্চার অসুখে করণীয় পাতায়। বয়স অনুযায়ী লেখা: ০–৩ মাস, ৬–১২ মাস, ১২–২৪ মাস।
সাধারণ প্রশ্ন
বাচ্চার জ্বর হলে করণীয় কী?
জরুরি কোনো লক্ষণ না থাকলে কুসুম গরম পানিতে গোসল করান বা কুসুম গরম পানিতে ভেজানো কাপড় দিয়ে গা মুছে দিন, আর হালকা জামা পরান। সবচেয়ে জরুরি হলো পানির ঘাটতি না হতে দেওয়া: বুকের দুধ আরও ঘন ঘন দিন; ৬ মাসের কম হলে শুধু বুকের দুধ, আর ছয় মাসের বেশি হলে পাশাপাশি স্যুপ, ভাতের মাড় বা পরিষ্কার পানির মতো তরল বেশি করে দিন।
নবজাতকের জ্বর হলে করণীয় কী?
WHO-র নির্দেশিকায় ২ মাসের কম বয়সী শিশুর বগলে মাপা তাপমাত্রা ৩৭.৫° সেলসিয়াস বা তার বেশি হওয়াকে খুব গুরুতর অসুখের লক্ষণ ধরা হয়। এমন হলে বাড়িতে অপেক্ষা না করে দেরি না করে ডাক্তার দেখান।
ছোট বাচ্চার জ্বরের ওষুধ কী দেব?
জ্বর কমানোর ওষুধ শুধু ডাক্তার বললে, আর ঠিক যেভাবে বলেছেন সেভাবে দিন। কোনো শিশুকেই অ্যাসপিরিন দেবেন না, আর ভেষজ বা টোটকা ওষুধও শিশুদের জন্য সাধারণত পরীক্ষিত বা নিরাপদ নয়।
বাচ্চার জ্বর হলে কখন হাসপাতালে যাব?
বাচ্চা কিছু পান করতে বা বুকের দুধ খেতে না পারলে, যা খায় সব বমি করে ফেললে, খিঁচুনি হলে, নিস্তেজ বা অচেতন হয়ে পড়লে, বা জ্বরের সঙ্গে ঘাড় শক্ত হয়ে গেলে এখনই হাসপাতালে যান। WHO-র IMCI নির্দেশিকা এগুলোকে জরুরি চিকিৎসার লক্ষণ ধরে।
জ্বর না কমলে কত দিন পর ডাক্তার দেখাব?
জরুরি লক্ষণ না থাকলেও জ্বর ২ থেকে ৩ দিনে না কমলে আবার ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীকে দেখান। IMCI অনুযায়ী প্রতিদিন জ্বর ৭ দিনের বেশি থাকলে আরও পরীক্ষার জন্য ডাক্তারের কাছে পাঠানো হয়।
Baby jor hole ki korbo?
বাচ্চার বয়স আর জ্বরের সঙ্গে অন্য কী লক্ষণ আছে, তা দেখে ঠিক করুন। এক মাসের কম বয়সী নবজাতকের জ্বর মারাত্মক সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে, তাই অপেক্ষা না করে ডাক্তার বা হাসপাতালে যান; ২ মাসের কম বয়সী শিশুর বগলে মাপা তাপমাত্রা ৩৭.৫° সেলসিয়াস বা তার বেশি হলেও তা-ই। বড় বাচ্চার ক্ষেত্রে কখন বাড়িতে যত্ন আর কখন ডাক্তার, তা ওপরের অংশে দেওয়া আছে।
এই লেখা শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য, ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শের বিকল্প নয়। সম্পূর্ণ সতর্কতা
সূত্র
কোনো তথ্য ভুল বা পুরোনো মনে হলে আমাদের জানান: ভুল জানান