হামের লক্ষণ: বাচ্চার যত্ন ও এমআর টিকা
হামের লক্ষণ চিনুন, বাড়িতে যত্ন নিন, আর বাচ্চার এমআর টিকা বাদ পড়লে বা কখনো না পেলে হামের টিকা ক্যাম্পেইনে কোথায় টিকা পাবেন, জেনে নিন। Measles symptoms in babies.
এক নজরে
- হামের শুরুতে জ্বর, সর্দি, কাশি, লাল চোখ ও গালের ভেতরে সাদা দাগ দেখা দেয়; ৩ থেকে ৫ দিন পরে মুখ থেকে সারা গায়ে র্যাশ ছড়ায়।
- লক্ষণ দেখলে এখনই ডাক্তার দেখান, আর ততক্ষণ বাচ্চাকে অসুস্থ নন এমন সদস্যদের থেকে দূরে রাখুন।
- হামের নির্দিষ্ট ওষুধ নেই; বুকের দুধ চালিয়ে যান, ৬ মাস বা তার বেশি হলে তরল ও পুষ্টিকর খাবার দিন; ভিটামিন এ ডাক্তার দেবেন।
- ইপিআই অনুযায়ী এমআর টিকা ৯ মাস ও ১৫ মাসে; পুরো সুরক্ষার জন্য দুটি ডোজই দরকার।
- বাচ্চা পান করতে না পারলে, খিঁচুনি বা শ্বাসকষ্ট হলে, বা চোখের মণি ঘোলাটে হলে এখনই হাসপাতালে যান।
হাম খুব ছোঁয়াচে একটি ভাইরাসজনিত অসুখ। এতে শিশু মারাত্মক অসুস্থ হতে পারে, এমনকি মারাও যেতে পারে, তাই হামের লক্ষণ (অনেকে যেটা খোঁজেন “ham er lokkhon” লিখে) আগে থেকে চিনে রাখুন। WHO জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে হামের বড় প্রাদুর্ভাবে সন্দেহভাজন রোগীদের প্রায় ৭৯% ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, আর মৃত্যুর বেশিরভাগই টিকা না পাওয়া দুই বছরের কম বয়সী শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে ১৫ মার্চ থেকে ৪ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত দেশে ২১,৭৪৮ জনের হাম পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে।
হাম রোগের লক্ষণ: কীভাবে চিনবেন
WHO বলছে, হামের লক্ষণ সাধারণত ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৭ থেকে ১৪ দিন পরে শুরু হয়। শুরুর লক্ষণগুলো সাধারণত ৪ থেকে ৭ দিন থাকে:
- জ্বর, অনেক সময় উচ্চ জ্বর
- সর্দি
- কাশি
- চোখ লাল হওয়া ও চোখ দিয়ে পানি পড়া
- গালের ভেতরের দিকে ছোট ছোট সাদা দাগ
প্রথম লক্ষণের ৩ থেকে ৫ দিন পরে র্যাশ ওঠে, সাধারণত প্রথমে মুখে ও গলার ওপরের দিকে। প্রায় ৩ দিনে তা নিচের দিকে বুক-পেট, হাত, পা ও পায়ের পাতায় ছড়িয়ে পড়ে, আর কয়েক দিন থাকার পর মিলিয়ে যায়।
ইউনিসেফ বাংলাদেশ জানায়, র্যাশ দেখতে ছোট, একটু উঁচু লাল দানার মতো, যা মিলে বড় ছোপ হয়ে যেতে পারে। সাধারণত চুলকায় না। কালো বা শ্যামলা ত্বকে র্যাশ সহজে চোখে না-ও পড়তে পারে। শুরুর লক্ষণ অন্য অসুখের মতো লাগতে পারে, তাই জ্বরের সঙ্গে এসব লক্ষণ দেখলে হাম হতে পারে বলে মাথায় রাখুন। বাচ্চার জ্বর নিয়ে সাধারণ করণীয় জানতে দেখুন বাচ্চার অসুখে করণীয় পাতা।
হাম কীভাবে ছড়ায়
- হামে আক্রান্ত কেউ শ্বাস নিলে, কাশি দিলে বা হাঁচি দিলে ভাইরাস ছড়ায়।
- WHO বলছে, ভাইরাস বাতাসে বা কোনো কিছুর গায়ে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে।
- র্যাশ ওঠার ৪ দিন আগে থেকে র্যাশ ওঠার ৪ দিন পর পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের মধ্যে হাম ছড়াতে পারে। তাই মা-বাবা টের পাওয়ার আগেই অন্য শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে যায়।
হাম কেন বিপজ্জনক
হামে মৃত্যুর বেশিরভাগই হয় জটিলতা থেকে। WHO ও ইউনিসেফের তালিকা অনুযায়ী জটিলতার মধ্যে আছে:
- অন্ধত্ব
- মস্তিষ্কে সংক্রমণ ও প্রদাহ (এনকেফালাইটিস)
- তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা
- কানে সংক্রমণ
- নিউমোনিয়াসহ তীব্র শ্বাসকষ্ট
পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জটিলতা বেশি হয়, বিশেষ করে যারা অপুষ্টিতে ভুগছে বা যাদের শরীরে ভিটামিন এ কম। ইউনিসেফ জানায়, হাম শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল করে দিতে পারে, ফলে পরে অন্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
বাচ্চার হাম হলে কী করবেন
ইউনিসেফ বাংলাদেশের পরামর্শ:
- জ্বর, কাশি, সর্দি, লাল চোখ আর র্যাশ দেখলে এখনই বাচ্চাকে ডাক্তার দেখান, বাচ্চার বয়স যত কমই হোক। টিকার বয়স (৯ মাস) হওয়ার আগেও শিশুর হাম হতে পারে।
- ডাক্তার না দেখা পর্যন্ত বাচ্চাকে বাড়িতে রাখুন, আর পরিবারের অসুস্থ নন এমন সদস্যদের থেকে দূরে রাখুন।
- হাম সারানোর নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। শরীর নিজেই ভাইরাসের সঙ্গে লড়ে; চিকিৎসা হয় লক্ষণ কমানো আর জটিলতা ঠেকানোর জন্য।
ডাক্তার যদি বাড়িতে রেখে যত্ন নিতে বলেন:
- বুকের দুধ খাওয়ালে তা চালিয়ে যান। ৬ মাসের কম বয়সী বাচ্চাকে পানি নয়, ঘন ঘন বুকের দুধ দিন।
- ৬ মাস বা তার বেশি বয়সী বাচ্চাকে প্রচুর পানি ও তরল দিন।
- পাতলা পায়খানা বা বমিতে হারানো পানি ফিরিয়ে দিতে খাবার স্যালাইন (ওআরএস) কাজে আসে; কতটুকু দেবেন, ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে জেনে নিন। দেখুন: বাচ্চার পাতলা পায়খানা হলে করণীয়: ওআরএস ও জিংক।
- ৬ মাস বা তার বেশি বয়সী বাচ্চাকে পুষ্টিকর খাবার দিন; এতে শরীর তাড়াতাড়ি সেরে ওঠে।
- নিউমোনিয়া বা চোখের সংক্রমণের জন্য ডাক্তার ওষুধ দিলে ঠিক যেভাবে বলেছেন সেভাবে খাওয়ান।
- WHO পাঁচ বছরের কম বয়সী হামে আক্রান্ত সব শিশুকে ভিটামিন এ দেওয়ার পরামর্শ দেয়। এটি ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মী দেবেন; ভিটামিন এ চোখের ক্ষতি ও অন্ধত্বের ঝুঁকি কমায়।
বাচ্চা অপুষ্টিতে ভুগলে তার চিকিৎসা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে করাতে হবে। লক্ষণ খারাপের দিকে গেলে দেরি না করে হাসপাতালে যান। জরুরি নম্বর ও পথে করণীয়: জরুরি অবস্থা।
এমআর টিকা: কখন দিতে হয়
হাম থেকে বাঁচার সবচেয়ে ভালো উপায় টিকা। বাংলাদেশের নিয়মিত টিকায় হামের টিকা দেওয়া হয় রুবেলার টিকার সঙ্গে মিলিয়ে, যার নাম হাম-রুবেলা বা এমআর টিকা।
- জাতীয় ইপিআই অনুযায়ী এমআর টিকার দুটি ডোজ: ৯ মাসে আর ১৫ মাসে।
- পুরো সুরক্ষার জন্য দুটি ডোজই দরকার। ইউনিসেফ জানায়, বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা সারা জীবন থাকে।
- হামের ছড়ানো থামাতে অন্তত ৯৫% শিশুর দুটি ডোজই পাওয়া দরকার।
সব টিকার পুরো সময়সূচি দেখুন: শিশুর টিকার সময়সূচি (ইপিআই)। টিকা নিয়ে আরও লেখা পাবেন টিকা পাতায়।
টিকা বাদ পড়লে কী করবেন
WHO জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রাদুর্ভাবের সময় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইন ৫ এপ্রিল ১৮টি অগ্রাধিকার জেলার ৩০টি উপজেলায় শুরু হয়, আর ২০ এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে চালু হয়। ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি নিয়মিত ইপিআই টিকাও চালু ছিল।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী (বাসস), আগের ক্যাম্পেইনে বাদ পড়া বা টিকা না পাওয়া ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য “ইনটেনসিফাইড এমআর ক্যাচ-আপ ভ্যাকসিনেশন” নামে বিশেষ টিকাদান চলবে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত (তারিখ ও কেন্দ্র আপনার ইপিআই টিকাকেন্দ্রে নিশ্চিত হয়ে নিন, বা ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করুন)। এই সময়ের মধ্যে যেসব শিশুর বয়স ৬ মাস পূর্ণ হবে, তারাও এই টিকা পাবে।
আপনার বাচ্চার এমআর টিকার কোনো ডোজ বাদ পড়ে থাকলে, বা সে আগের ক্যাম্পেইনে টিকা না পেয়ে থাকলে, অপেক্ষা করবেন না। আপনার এলাকায় কোথায় টিকা দেওয়া হচ্ছে, তা নিকটস্থ ইপিআই টিকাকেন্দ্রে বা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে জেনে নিন। টিকা কার্ড সঙ্গে রাখুন।
সাধারণ প্রশ্ন
হামের লক্ষণ কী কী?
WHO বলছে, ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৭ থেকে ১৪ দিন পরে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া ও চোখ দিয়ে পানি পড়া, আর গালের ভেতরের দিকে ছোট ছোট সাদা দাগ দেখা দেয়। প্রথম লক্ষণের ৩ থেকে ৫ দিন পরে র্যাশ ওঠে, সাধারণত প্রথমে মুখে ও গলার ওপরের দিকে, তারপর নিচের দিকে সারা গায়ে ছড়িয়ে পড়ে।
বাচ্চার হাম হলে করণীয় কী?
জ্বর, কাশি, সর্দি, লাল চোখ আর র্যাশ দেখলে এখনই বাচ্চাকে ডাক্তার দেখান, আর ততক্ষণ বাড়িতে রেখে পরিবারের অসুস্থ নন এমন সদস্যদের থেকে দূরে রাখুন। হাম সারানোর নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই; চিকিৎসা হয় লক্ষণ কমানো আর জটিলতা ঠেকানোর জন্য।
হাম হলে বাচ্চাকে কী খাওয়াবেন?
বুকের দুধ খাওয়ালে তা চালিয়ে যান; ৬ মাসের কম বয়সী বাচ্চাকে পানি নয়, ঘন ঘন বুকের দুধ দিন। ৬ মাস বা তার বেশি বয়সী বাচ্চাকে প্রচুর পানি ও তরল আর পুষ্টিকর খাবার দিন; এতে শরীর তাড়াতাড়ি সেরে ওঠে।
হামের টিকা (এমআর টিকা) কখন দিতে হয়?
জাতীয় ইপিআই অনুযায়ী এমআর টিকার দুটি ডোজ: ৯ মাসে আর ১৫ মাসে। পুরো সুরক্ষার জন্য দুটি ডোজই দরকার।
হামের টিকা ক্যাম্পেইন ২০২৬: টিকা বাদ পড়লে এমআর টিকা কোথায় দেয়?
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী (বাসস), আগের ক্যাম্পেইনে বাদ পড়া বা টিকা না পাওয়া ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ এমআর ক্যাচ-আপ টিকাদান চলবে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। আপনার এলাকায় কোথায় টিকা দেওয়া হচ্ছে, তা নিকটস্থ ইপিআই টিকাকেন্দ্রে বা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে জেনে নিন, বা ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করুন; টিকা কার্ড সঙ্গে রাখুন।
Ham rog hole ki hoy?
হাম খুব ছোঁয়াচে একটি ভাইরাসজনিত অসুখ। এতে শিশু মারাত্মক অসুস্থ হতে পারে, এমনকি মারাও যেতে পারে। WHO বলছে, লক্ষণ সাধারণত ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৭ থেকে ১৪ দিন পরে শুরু হয়।
এই লেখা শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য, ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শের বিকল্প নয়। সম্পূর্ণ সতর্কতা
সূত্র
- WHO – Measles (fact sheet) — WHO
- UNICEF Bangladesh – Frequently asked questions about measles in Bangladesh — UNICEF
- WHO – Disease Outbreak News: Measles – Bangladesh (2026) — WHO
- WHO Bangladesh – Bangladesh launches emergency measles-rubella campaign with UNICEF, WHO and Gavi (5 April 2026) — WHO
- WHO – Integrated Management of Childhood Illness (IMCI) chart booklet (March 2014) — WHO
- DGHS – হাম প্রেস রিলিজ (press releases, 4 October 2026) — DGHS
- BSS – Govt to launch month-long special measles vaccination campaign on Sept 26 (20 September 2026) — Government of Bangladesh
- DGHS – স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ — DGHS
কোনো তথ্য ভুল বা পুরোনো মনে হলে আমাদের জানান: ভুল জানান