ছয় মাস পর বাচ্চার পরিপূরক খাবার শুরু
ছয় মাস পূর্ণ হলে বুকের দুধের পাশাপাশি অল্প অল্প করে ঘরের নরম খাবার শুরু করুন, আর বুকের দুধ চালিয়ে যান দুই বছর বা তার বেশি।
এক নজরে
- ছয় মাস পূর্ণ হলে, অর্থাৎ ১৮১তম দিন থেকে, বুকের দুধের পাশাপাশি পরিপূরক খাবার শুরু করুন।
- বুকের দুধ চালিয়ে যান, দুই বছর বা তার বেশি বয়স পর্যন্ত।
- প্রতিদিন অন্তত চার ধরনের খাবার দিন, আর দিনে অন্তত একবার ডিম, মাছ, মাংস বা কলিজার মতো প্রাণিজ খাবার।
- এক বছরের আগে মধু দেবেন না, আর বেশি লবণ বা চিনি দেওয়া খাবার এড়িয়ে চলুন।
- অসুখের সময় খাওয়ানো বন্ধ করবেন না; শিশু কিছু পান করতে না পারলে বা নিস্তেজ হয়ে পড়লে দেরি না করে হাসপাতালে যান।
ছয় মাস বয়সের পর শিশুর শরীরের দরকার শুধু বুকের দুধে আর পুরোপুরি মেটে না। তখন বুকের দুধের পাশাপাশি অন্য খাবার দিতে হয়, যাকে বলে পরিপূরক খাবার। WHO বলছে, খুব আগে বা খুব দেরিতে শুরু করলে শিশুর বৃদ্ধি পিছিয়ে যেতে পারে।
কখন শুরু করবেন
- শিশুর বয়স ছয় মাস পূর্ণ হলে, অর্থাৎ ১৮১তম দিন থেকে শুরু করুন। বাংলাদেশের জাতীয় নির্দেশিকা এভাবেই বলে।
- ছয় মাসের আগে বুকের দুধ ছাড়া অন্য কিছু দেবেন না, এমনকি পানিও নয়। কেন, পড়ুন: প্রথম ছয় মাস বাচ্চাকে শুধু বুকের দুধ কেন।
- শুরুর পরেও বুকের দুধ বন্ধ করবেন না। দিনে-রাতে শিশু যখন চায়, খাওয়াতে থাকুন, দুই বছর বা তার বেশি বয়স পর্যন্ত।
WHO জানায়, ৬ থেকে ১২ মাস বয়সে শিশুর দরকারি শক্তির অর্ধেক বা তার বেশি তখনও বুকের দুধ থেকেই আসতে পারে। ১২ থেকে ২৪ মাসে আসে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
কতবার, কতটুকু খাওয়াবেন
শুরু করুন অল্প দিয়ে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিমাণ, ঘনত্ব আর খাবারের বৈচিত্র্য একটু একটু করে বাড়ান। নিচের ছকে দিনে কতবার খাওয়াবেন, তা WHO-র পরামর্শ থেকে নেওয়া। খাবারের ধরন আর প্রতিবার কতটুকু, তা বাংলাদেশের জাতীয় নির্দেশিকা থেকে নেওয়া, যেখানে ২৫০ মিলিলিটারের একটি বাটিকে মাপ ধরা হয়েছে।
| বয়স | কী ধরনের খাবার (জাতীয় নির্দেশিকা) | প্রতিবার কতটুকু (জাতীয় নির্দেশিকা) | দিনে কতবার (WHO) |
|---|---|---|---|
| ৬ থেকে ৮ মাস | চটকানো, আধা-শক্ত ঘরের খাবার | আধা বাটি | ২–৩ বার, সঙ্গে ১–২ বার পুষ্টিকর নাশতা |
| ৯ থেকে ১১ মাস | ছোট টুকরো করা নরম ঘরের খাবার | আধা বাটি | ৩–৪ বার, সঙ্গে ১–২ বার নাশতা |
| ১২ থেকে ২৩ মাস | পরিবারের সাধারণ খাবার, ছোট টুকরো | এক বাটি | ৩–৪ বার, সঙ্গে ১–২ বার নাশতা |
প্রতিটি শিশু আলাদা। শিশুর খিদে ও পেট ভরার ইঙ্গিত বুঝে খাওয়ান।
কী খাওয়াবেন
আলাদা দামি খাবার লাগে না। পরিবারের জন্য যা রান্না হয়, সেখান থেকেই শিশুর উপযোগী করে নিন। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান (আইপিএইচএন) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশিকা বলছে, প্রতিদিন অন্তত চার ধরনের খাবার দিন, আর দিনে অন্তত একবার প্রাণিজ খাবার।
- প্রাণিজ খাবার: ডিম, মাছ, মাংস, কলিজা।
- ডাল: শুধু পাতলা পানি নয়, ডালের ঘন অংশ।
- শাকসবজি ও ফল: গাঢ় সবুজ শাক, আর লাল বা কমলা রঙের ফল ও সবজি, যেমন পাকা পেঁপে, আম, মিষ্টি কুমড়া, গাজর।
- ভাত, খিচুড়ি বা রুটি, সঙ্গে অল্প তেল।
এক বছর বয়সের আগে শিশুকে মধু দেবেন না। WHO সতর্ক করেছে, মধু থেকে শিশুদের বোটুলিজম নামে একটি মারাত্মক অসুখ হতে পারে।
বেশি লবণ বা চিনি দেওয়া খাবার আর পানীয় এড়িয়ে চলুন। নির্দেশিকা বলছে, এগুলোতে অভ্যস্ত হলে শিশুর খিদে নষ্ট হয় এবং স্বাস্থ্যকর খাবারে আগ্রহ কমে যায়।
কীভাবে খাওয়াবেন
- ধৈর্য ধরে, ভালোবেসে: শিশুকে খেতে উৎসাহ দিন, সময় দিন, প্রশংসা করুন। কখনো জোর করে খাওয়াবেন না।
- মনোযোগ রাখুন: খাওয়ার সময় টিভি বা মোবাইলের মতো জিনিস সরিয়ে রাখলে শিশু খাবারে মন দেয়।
- নিজে খেতে দিন: ৯ মাসের পর অনেক শিশু নিজে হাতে খেতে শুরু করে। এটাকে উৎসাহ দিন।
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: খাবার বানানোর আগে আর শিশুকে খাওয়ানোর আগে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন। শিশু নিজে খেলে তারও হাত ধুইয়ে দিন। খাবার পরিষ্কারভাবে রান্না ও সংরক্ষণ করুন। ছয় মাস পর শিশুকে যে পানি দেবেন, আর খাবার বানাতে যে পানি লাগবে, তা যেন নিরাপদ ও পরিষ্কার হয়। WHO বলছে, নিরাপদ খাবার পানি ডায়রিয়া প্রতিরোধের একটি প্রধান উপায়।
- বোতল নয়: বোতল দিয়ে খাওয়াবেন না। কাপ বা চামচ ব্যবহার করুন।
অসুখের সময় ও পরে
শিশু অসুস্থ হলে খাওয়ানো বন্ধ করবেন না। WHO ও জাতীয় নির্দেশিকা দুটোই বলছে:
- আরও ঘন ঘন বুকের দুধ দিন, তরল খাবার বাড়ান।
- শিশুর পছন্দের নরম খাবার অল্প অল্প করে বারবার দিন।
- জাতীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী, সেরে ওঠার পর ১০ থেকে ১৫ দিন, অথবা ওজন আগের জায়গায় না ফেরা পর্যন্ত, বেলার সংখ্যা ও প্রতিবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিন।
ডায়রিয়া হলে খাবারের পাশাপাশি খাবার স্যালাইন ও জিংক লাগে। দেখুন: বাচ্চার পাতলা পায়খানা হলে করণীয়: ওআরএস ও জিংক।
অসুখের সময় শিশু কিছু পান করতে বা বুকের দুধ খেতে না পারলে, বা নিস্তেজ হয়ে পড়লে, দেরি না করে হাসপাতালে যান। বিপদ চিহ্নগুলো দেখুন জরুরি অবস্থা পাতায়।
শিশু অনেক দিন ধরে খেতে না চাইলে, ওজন না বাড়লে বা খুব রোগা হয়ে গেলে ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিন।
এই লেখা শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য, ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শের বিকল্প নয়। সম্পূর্ণ সতর্কতা
সূত্র
- WHO – Infant and young child feeding (fact sheet) — WHO
- WHO – Guideline for complementary feeding of infants and young children 6–23 months of age (2023) — WHO
- IPHN/DGHS Bangladesh – Clinical Guidelines on Infant and Young Child Feeding (IYCF) — IPHN
- WHO – Diarrhoeal disease (fact sheet) — WHO
- WHO – Botulism (fact sheet) — WHO
কোনো তথ্য ভুল বা পুরোনো মনে হলে আমাদের জানান: ভুল জানান