বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সঠিক নিয়ম ও অবস্থান

বুকের দুধ খাওয়ানোর নিয়ম ধাপে ধাপে: কীভাবে ধরবেন, মুখ লাগানোর লক্ষণ, শুয়ে খাওয়ানো, কতবার ও কতক্ষণ, আর হাতে দুধ বের করে কাপে খাওয়ানো। WHO ও UNICEF।

এক নজরে

  • বাচ্চার মাথা ও শরীর এক সরলরেখায় রাখুন, শরীরের কাছে টেনে নিন, পুরো শরীরে ভর দিন, আর নাক বোঁটার ঠিক সামনে আনুন।
  • মুখ ঠিকমতো লাগলে: থুতনি স্তন ছোঁয়, মুখ বড় করে খোলা, নিচের ঠোঁট বাইরে উল্টানো, আর বোঁটার চারপাশের কালো অংশ মুখের ওপরে বেশি দেখা যায়; মায়ের ব্যথা হয় না।
  • দিনে-রাতে বাচ্চা যতবার আর যতক্ষণ চায় খাওয়ান, ৬ মাসের কম বয়সে ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৮ বার; ৬ মাস পর্যন্ত পানিও নয়।
  • সরাসরি খাওয়াতে না পারলে হাতে দুধ বের করে কাপে খাওয়ান, বোতলে নয়।
  • বাচ্চা বুকের দুধ টানতে না পারলে, বা খিঁচুনি, খুব নিস্তেজ হওয়ার মতো বিপদ চিহ্ন দেখলে এখনই হাসপাতালে যান; দেখুন জরুরি অবস্থা পাতা।

বুকের দুধ খাওয়ানোর নিয়ম (অনেকে যেটা খোঁজেন “buker dudh khawanor niyom” লিখে) শিখতে সময় লাগে, মা ও বাচ্চা দুজনেরই। UNICEF বলছে, বাচ্চা জন্ম থেকেই মায়ের স্তন খোঁজে, তবু অনেক মায়ের বাচ্চাকে ঠিকভাবে ধরতে আর মুখ লাগাতে সাহায্য লাগে। নিচে WHO-র শিশু-স্বাস্থ্য নির্দেশিকা (IMCI) আর UNICEF অনুযায়ী ধাপগুলো দেওয়া হলো।

ধাপ ১: বাচ্চাকে ঠিকভাবে ধরুন

IMCI আর UNICEF অনুযায়ী ঠিকভাবে ধরার চারটি লক্ষণ:

  • বাচ্চার মাথা ও শরীর এক সরলরেখায়। মাথা বাঁকা বা মোচড়ানো থাকলে বাচ্চা সহজে চুষতে বা গিলতে পারে না।
  • বাচ্চা মায়ের শরীরের কাছে। দূরে থাকলে ঠিকমতো মুখ লাগাতে পারে না।
  • বাচ্চার পুরো শরীরে হাতের ভর, শুধু ঘাড় আর কাঁধে নয়। নবজাতক আর ছোট বাচ্চার জন্য এটা বিশেষ জরুরি।
  • বাচ্চার নাক বোঁটার ঠিক সামনে, যাতে সে বোঁটার নিচ দিক থেকে স্তনের দিকে আসে।

ধাপ ২: মুখ লাগাতে সাহায্য করুন

IMCI বলছে:

  1. বোঁটা দিয়ে বাচ্চার ঠোঁট ছুঁয়ে দিন।
  2. বাচ্চা মুখ বড় করে না খোলা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।
  3. তখন বাচ্চাকে দ্রুত স্তনের কাছে আনুন, নিচের ঠোঁট যেন বোঁটার বেশ নিচে থাকে।

মুখ ঠিকমতো লাগার লক্ষণ (সব কটি থাকা চাই):

  • থুতনি স্তন ছুঁয়ে আছে বা প্রায় ছুঁয়ে আছে।
  • মুখ বড় করে খোলা।
  • নিচের ঠোঁট বাইরের দিকে উল্টানো।
  • মুখের নিচের চেয়ে ওপরে বোঁটার চারপাশের কালো অংশ বেশি দেখা যায়।

UNICEF বলছে, ঠিকমতো মুখ লাগলে মায়ের ব্যথা হয় না। মুখ বা চোষা ঠিক না হলে আবার চেষ্টা করুন।

ভালোভাবে চুষছে কি না: বাচ্চা ধীরে, গভীরভাবে চোষে, মাঝে মাঝে থামে; এক-দুবার চোষার পর গেলার শব্দ শোনা বা দেখা যেতে পারে। খাওয়া শেষে বাচ্চা নিজে স্তন ছেড়ে দেয়, তৃপ্ত আর শান্ত দেখায়, আর স্তন নরম লাগে (UNICEF)।

কোন অবস্থানে খাওয়াবেন

UNICEF পাঁচটি অবস্থানের কথা বলে। যেটায় বাচ্চা ভালোভাবে খায় আর আপনি আরাম পান, সেটাই ভালো:

  • কোলে ধরে (ক্র্যাডল): হাতলওয়ালা চেয়ার বা বালিশে হাতের ভর রেখে বসুন, বাচ্চার মাথা হাতের ভাঁজে, বাচ্চার বুক আপনার বুকের দিকে, যাতে মাথা ঘোরাতে না হয়।
  • উল্টো হাতে ধরে (ক্রস-ক্র্যাডল): উপরের মতোই, তবে বাচ্চার মাথা হাতের তালুতে। শিখতে শুরু করার সময় আর ছোট বাচ্চার জন্য সুবিধার।
  • বগলের নিচে ধরে (ফুটবল হোল্ড): বাচ্চার শরীর আপনার বাহুর ওপর, পা বগলের নিচে, মুখ স্তনের দিকে; অন্য হাতে স্তন ধরুন। UNICEF বলছে, স্তন ফুলে গেলে, বোঁটায় ব্যথা হলে বা সিজারের পর পেটের ওপর বাচ্চা রাখতে না পারলে এটা কাজে লাগে।
  • পাশ ফিরে শুয়ে: নিজে পাশ ফিরে শুয়ে বাচ্চাকেও পাশ ফিরিয়ে আপনার দিকে মুখ করে শোয়ান, মাথা স্তনের কাছে। পিঠে বালিশ দিন, আর খেয়াল রাখুন বাচ্চার নাক যেন বন্ধ না হয়।
  • হেলান দিয়ে: বালিশে হেলান দিন, পুরো সমান হয়ে নয়; বাচ্চাকে উপুড় করে আপনার বুকের ওপর রাখুন। বাচ্চা মুখ লাগাতে কষ্ট পেলে বা অস্থির হয়ে কাঁদলে UNICEF এটা চেষ্টা করতে বলে।

কতবার, কতক্ষণ

  • WHO বলছে, বাচ্চা যতবার চায়, দিনে ও রাতে খাওয়ান। IMCI বলছে, যতবার আর যতক্ষণ চায়; ৬ মাসের কম বয়সে ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৮ বার। ঘন ঘন খাওয়ালে দুধ বেশি তৈরি হয়।
  • খিদের লক্ষণ দেখলেই খাওয়ান: উসখুস করা, আঙুল চোষা, ঠোঁট নাড়ানো (IMCI)।
  • কম ওজনের ছোট বাচ্চাকে IMCI অন্তত ২–৩ ঘণ্টা পরপর খাওয়াতে বলে; ৩ ঘণ্টা পরও নিজে না জাগলে জাগিয়ে খাওয়ান।
  • ৬ মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ; পানি বা অন্য কিছু নয় (WHO)। বিস্তারিত: প্রথম ছয় মাস বাচ্চাকে শুধু বুকের দুধ কেন।

শুরুটা জন্মের প্রথম ঘণ্টাতেই: জন্মের পর প্রথম ঘণ্টায় বুকের দুধ ও শালদুধ। দুধ কম মনে হলে পড়ুন: বাচ্চার জন্য বুকের দুধ বাড়ানোর উপায়।

হাতে দুধ বের করে কাপে খাওয়ানো

কাজে ফেরা বা অন্য কারণে সরাসরি খাওয়াতে না পারলে UNICEF বলছে, দুধ বের করে রেখে খাওয়ানো যায়, আর বাড়িতে থাকলে সরাসরি খাওয়ান। IMCI-র ধাপ:

  1. হাত ভালো করে ধুয়ে নিন, আরাম করে বসুন।
  2. চওড়া মুখের একটি পাত্র বোঁটা ও তার চারপাশের নিচে ধরুন।
  3. বুড়ো আঙুল স্তনের ওপরে আর তর্জনী নিচে, মুখোমুখি, বোঁটার আগা থেকে অন্তত ৪ সেন্টিমিটার দূরে রাখুন।
  4. আঙুলের মাঝের অংশ কয়েকবার আলতো চেপে ছেড়ে দিন। দুধ না এলে আঙুল বোঁটার একটু কাছে এনে আবার করুন।
  5. বোঁটা চিপবেন না, ত্বক ঘষবেন না। স্তনের চারপাশ ঘুরে একই দূরত্বে চাপ দিন।

কাপে খাওয়ানো (IMCI): বাচ্চাকে কোলে আধা-সোজা করে বসান, কাপটি নিচের ঠোঁটে আলতো রাখুন, এমনভাবে কাত করুন যাতে দুধ শুধু ঠোঁট ছোঁয়। বাচ্চাকে নিজে টেনে খেতে দিন; মুখে ঢেলে দেবেন না।

মায়ের ব্যথা বা সমস্যা হলে

UNICEF বলছে, বোঁটায় ব্যথা বা ফাটল সাধারণত ঠিকমতো মুখ না লাগার লক্ষণ। বোঁটা ফেটে গেলে বা রক্ত পড়লে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাস্থ্যকর্মীর সাহায্য নিন। যেকোনো প্রশ্নে কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান, বা স্বাস্থ্য বাতায়নে ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করুন।

কখন দেরি না করে হাসপাতালে যাবেন

WHO-র IMCI নির্দেশিকা অনুযায়ী ২ মাসের কম বয়সী শিশুর নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ খুব গুরুতর অসুখের লক্ষণ হতে পারে। এখনই হাসপাতালে নিন:

  • ঠিকমতো খেতে পারছে না।
  • খিঁচুনি হয়েছে।
  • দ্রুত শ্বাস: মিনিটে ৬০ বা বেশি।
  • শ্বাস নেওয়ার সময় বুকের নিচের অংশ জোরে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে।
  • বগলে মাপা তাপমাত্রা ৩৭.৫° সেলসিয়াস বা তার বেশি, অথবা ৩৫.৫° সেলসিয়াসের কম।
  • শুধু নাড়া দিলে নড়ছে, অথবা একেবারেই নড়ছে না।

২ মাস থেকে ৫ বছর বয়সে IMCI অনুযায়ী নিচের যেকোনো একটি সাধারণ বিপদ চিহ্ন থাকলে এখনই হাসপাতালে নিন:

  • শিশু কিছু পান করতে পারছে না, বা বুকের দুধ টানতে পারছে না।
  • যা খায় বা পান করে, সব বমি করে ফেলে দিচ্ছে।
  • খিঁচুনি হচ্ছে, বা হয়েছে।
  • শিশু খুব নিস্তেজ, বা অচেতন।

নবজাতকের আরও বিপদ চিহ্ন: নবজাতকের বিপদ চিহ্ন। জরুরি নম্বর আর পথে কী করবেন: জরুরি অবস্থা।

সাধারণ প্রশ্ন

বুকের দুধ খাওয়ানোর সঠিক নিয়ম কী?

বাচ্চার মাথা ও শরীর এক সরলরেখায় রেখে নিজের শরীরের কাছে টেনে নিন, পুরো শরীরে ভর দিন, নাক বোঁটার সামনে আনুন। বোঁটা দিয়ে ঠোঁট ছুঁয়ে দিন, মুখ বড় করে খুললে দ্রুত স্তনে আনুন, যাতে নিচের ঠোঁট বোঁটার বেশ নিচে থাকে। এটা WHO-র IMCI নির্দেশিকার ধাপ।

নবজাতককে বুকের দুধ কতক্ষণ ধরে খাওয়াব?

IMCI বলছে, বাচ্চা যতবার আর যতক্ষণ চায়, দিনে-রাতে খাওয়ান। UNICEF বলছে, ভালোভাবে খাওয়া বাচ্চা নিজে স্তন ছেড়ে দেয়, তৃপ্ত আর শান্ত দেখায়, আর খাওয়ার পর স্তন নরম লাগে।

শুয়ে বুকের দুধ খাওয়ানোর নিয়ম কী?

UNICEF বলছে, পাশ ফিরে শুয়ে বাচ্চাকেও পাশ ফিরিয়ে আপনার দিকে মুখ করে শোয়ান, মাথা স্তনের কাছে। পিঠে বালিশ দিন, আর খেয়াল রাখুন বাচ্চার নাক যেন বন্ধ না হয়।

বুকের দুধ পাম্প করে খাওয়ানোর নিয়ম কী?

আমাদের সূত্রে হাতে দুধ বের করার নিয়ম আছে, পাম্পের নয়। IMCI অনুযায়ী হাত ধুয়ে, চওড়া মুখের পাত্র ধরে, বোঁটা থেকে অন্তত ৪ সেন্টিমিটার দূরে বুড়ো আঙুল ও তর্জনী রেখে আলতো চেপে-ছেড়ে দুধ বের করুন। তারপর কাপে খাওয়ান, বোতলে নয়।

Buker dudh khawanor niyom ki?

ঠিকভাবে ধরা আর ঠিকভাবে মুখ লাগানো: মাথা-শরীর এক রেখায়, শরীরের কাছে, নাক বোঁটার সামনে। থুতনি স্তন ছোঁবে, মুখ বড় করে খোলা, নিচের ঠোঁট বাইরে উল্টানো। দিনে-রাতে বাচ্চা যতবার চায় খাওয়ান; ৬ মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ, পানিও নয়।

এই লেখা শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য, ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শের বিকল্প নয়। সম্পূর্ণ সতর্কতা

সূত্র

  1. UNICEF Parenting – Common breastfeeding positions — UNICEF
  2. UNICEF Parenting – 5 common breastfeeding problems — UNICEF
  3. UNICEF Parenting – 14 myths about breastfeeding — UNICEF
  4. WHO – Integrated Management of Childhood Illness (IMCI) chart booklet (March 2014) — WHO
  5. WHO – Infant and young child feeding (fact sheet) — WHO
  6. DGHS – স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ — DGHS

কোনো তথ্য ভুল বা পুরোনো মনে হলে আমাদের জানান: ভুল জানান