বাচ্চার জন্য বুকের দুধ বাড়ানোর উপায়: যা কাজ করে, যা মিথ

বাচ্চার জন্য বুকের দুধ বাড়ানোর উপায় মূলত ঘন ঘন খাওয়ানো আর সঠিকভাবে মুখ লাগানো। শিশু যথেষ্ট পাচ্ছে কি না, মায়ের খাবার নিয়ে মিথ, আর কখন সাহায্য নেবেন।

এক নজরে

  • UNICEF বলছে, প্রায় সব মা-ই শিশুর জন্য যথেষ্ট দুধ তৈরি করেন; দুধ কতটা হবে তা নির্ভর করে শিশু কতটা ভালোভাবে মুখ লাগায়, কত ঘন ঘন খায় আর প্রতিবার কতটা দুধ টেনে নেয় তার ওপর।
  • দিনে-রাতে শিশু যতবার চায় ততবার বুকের দুধ দিন, ৬ মাসের কম বয়সে অন্তত ২৪ ঘণ্টায় ৮ বার; WHO-র IMCI নির্দেশিকা বলছে, ঘন ঘন খাওয়ালে দুধ বেশি তৈরি হয়।
  • ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ; পানি, মধু বা অন্য কোনো খাবার বা পানীয় নয়।
  • দুধ বাড়ানোর কোনো ট্যাবলেট বা পাউডার এই সূত্রগুলোতে নেই; মা কোনো ওষুধ খেলে শুধু চিকিৎসকের পরামর্শে খান।
  • শিশু বুকের দুধ টানতে না পারলে, বা খিঁচুনি, খুব নিস্তেজ হওয়ার মতো বিপদ চিহ্ন দেখলে এখনই হাসপাতালে যান; দেখুন জরুরি অবস্থা পাতা।

বাচ্চার জন্য বুকের দুধ বাড়ানোর উপায় খুঁজছেন (অনেকে যেটা খোঁজেন “buker dudh bare ki khele” লিখে)? প্রথমে একটা ভালো খবর: UNICEF বলছে, প্রায় সব মা-ই তাঁর শিশুর জন্য ঠিক পরিমাণ দুধ তৈরি করেন। দুধ কতটা হবে তা নির্ভর করে তিনটি জিনিসের ওপর: শিশু কতটা ভালোভাবে মুখ লাগায়, কত ঘন ঘন খায়, আর প্রতিবার কতটা দুধ টেনে নেয়। কী সত্যিই কাজ করে আর কোনটা মিথ, তা নিচে দেওয়া হলো।

“দুধ কম” মনে হওয়া কেন এত সাধারণ

“অনেক মায়ের দুধ যথেষ্ট হয় না”, এটা UNICEF-এর তালিকায় একটি প্রচলিত মিথ। দুধ কম মনে হলে চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। UNICEF বলছে, এমন হলে স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলুন; বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো একটা কারণ থাকে, যা তাঁরা খুঁজে বের করতে সাহায্য করতে পারেন।

UNICEF দুধ কম হওয়ার যে সাধারণ কারণগুলো বলছে:

  • জন্মের পর বুকের দুধ শুরু করতে দেরি।
  • ত্বকে ত্বক স্পর্শ না হওয়া বা খুব কম হওয়া।
  • শিশু ঠিকমতো মুখ না লাগানো।
  • ঘড়ি ধরে নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়ানো, অল্প সময় খাওয়ানো, কম কম খাওয়ানো।
  • রাতে না খাওয়ানো।
  • দুশ্চিন্তা, আত্মবিশ্বাসের অভাব আর ক্লান্তি।
  • প্রসবের জটিলতা, অসুস্থতা বা ডায়াবেটিসের কারণে দুধ আসতে দেরি।

বেশি দুধের মূল নিয়ম: ঘন ঘন খাওয়ানো আর সঠিকভাবে মুখ লাগানো

ঘন ঘন খাওয়ান। WHO বলছে, শিশু যতবার চায় ততবার, দিনে ও রাতে বুকের দুধ দিন। WHO-র IMCI নির্দেশিকা বলছে, ৬ মাসের কম বয়সে অন্তত ২৪ ঘণ্টায় ৮ বার খাওয়ান; ঘন ঘন খাওয়ালে দুধ বেশি তৈরি হয়। শিশু খিদের লক্ষণ দেখালে, যেমন উসখুস করা, আঙুল চোষা বা ঠোঁট নাড়ানো, তখনই খাওয়ান।

সঠিকভাবে মুখ লাগান। UNICEF-এর ধাপ:

  1. শিশুর নাক আপনার স্তনের বোঁটার ঠিক সামনে আনুন।
  2. শিশুর মাথা একটু পেছনে হেলতে দিন, যাতে ওপরের ঠোঁট বোঁটা ছুঁয়ে যায়; এতে শিশু মুখ খোলে।
  3. মুখ বড় করে খুললে, থুতনি আগে রেখে শিশুকে দ্রুত স্তনের কাছে আনুন, যাতে শিশু শুধু বোঁটা নয়, স্তনের অনেকটা অংশ মুখে নেয়।

শুরুটা ঠিক রাখুন। UNICEF বলছে, জন্মের পরপরই ত্বকে ত্বক স্পর্শ আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বুকের দুধ শুরু করা, শিশুকে দিনরাত মায়ের কাছে একই ঘরে রাখা, আর শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো দুধ কমে যাওয়া প্রতিরোধে সাহায্য করে। বিস্তারিত: জন্মের প্রথম ঘণ্টায় বুকের দুধ।

শিশু যথেষ্ট পাচ্ছে কি না বোঝার উপায়

WHO-র IMCI নির্দেশিকা অনুযায়ী মুখ ঠিকমতো লাগলে এই চারটি লক্ষণ একসঙ্গে দেখা যায়:

  • থুতনি স্তন ছুঁয়ে আছে।
  • মুখ বড় করে খোলা।
  • নিচের ঠোঁট বাইরের দিকে উল্টানো।
  • মুখের নিচের চেয়ে ওপরে স্তনের বোঁটার চারপাশের কালো অংশ বেশি দেখা যায়।

শিশু ধীরে, গভীরভাবে চুষছে আর মাঝে মাঝে থামছে, এটাও ভালোভাবে খাওয়ার লক্ষণ। UNICEF বলছে, ঠিকমতো মুখ লাগলে মায়ের ব্যথা হয় না; বোঁটায় ব্যথা বা ফাটল সাধারণত ঠিকমতো মুখ না লাগার লক্ষণ।

২ মাসের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে IMCI অনুযায়ী শিশু ২৪ ঘণ্টায় ৮ বারের কম বুকের দুধ খেলে, ঠিকমতো মুখ লাগাতে না পারলে, বুকের দুধের পাশাপাশি অন্য খাবার বা পানীয় পেলে, বা বয়সের তুলনায় ওজন কম হলে, তা খাওয়ানোর সমস্যা; স্বাস্থ্যকর্মীকে দেখান। শিশুর ওজন ঠিকমতো বাড়ছে কি না, তা নিয়মিত ওজন মেপে স্বাস্থ্যকর্মী বলতে পারবেন।

মায়ের খাবার ও পানি: সূত্র কী বলে

  • সুষম খাবার খান। UNICEF বলছে, বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় শুধু সাদামাটা খাবার খেতে হবে, এটা মিথ। অন্য সবার মতোই সুষম খাবার দরকার; সাধারণত খাবারের অভ্যাস বদলানোর প্রয়োজন নেই।
  • ভালোভাবে খান ও পান করুন। UNICEF মায়ের সুস্থ থাকার জন্য ভালোভাবে খাওয়া ও পান করা, বাড়িতে সাহায্য আর স্বাস্থ্যকর্মীর নিয়মিত পরামর্শের কথা বলছে।
  • অসুস্থ হলেও সাধারণত বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়া যায়, অসুখের ধরন অনুযায়ী। UNICEF বলছে, ঠিক চিকিৎসা নিন, বিশ্রাম নিন, ভালোভাবে খান ও পান করুন।
  • মিথ: বোঁটা ধুয়ে তারপর খাওয়াতে হবে। UNICEF বলছে, খাওয়ানোর আগে বোঁটা ধোয়ার দরকার নেই।

শিশুর জন্য পানি নয়। দুধ কম মনে হলেও ৬ মাসের কম বয়সী শিশুকে পানি, মধু বা অন্য কিছু দেবেন না। WHO বলছে, চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়া অন্য কোনো খাবার বা পানীয়, এমনকি পানিও নয়। বিস্তারিত: প্রথম ৬ মাস শুধু বুকের দুধ।

ট্যাবলেট, পাউডার আর “বিশেষ খাবার” নিয়ে সতর্কতা

অনেকে দুধ বাড়ানোর ট্যাবলেট, পাউডার বা বিশেষ কোনো খাবারের কথা জানতে চান। আমাদের সূত্রগুলোতে (WHO, UNICEF, DGHS) এমন কোনো পরামর্শ নেই, তাই আমরা কোনো নাম বলছি না। UNICEF বলছে, কোনো ওষুধ খাওয়ার আগে ডাক্তারকে জানান যে আপনি বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন, আর শিশুর ডাক্তারকেও জানান আপনি কী ওষুধ খাচ্ছেন। প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো ওষুধ খাবেন না।

মায়ের স্তনে সমস্যা হলে

  • স্তন ফুলে শক্ত হলে: UNICEF বলছে, স্তন গরম, ভারী, শক্ত আর ব্যথা হতে পারে, লাল ও চকচকে দেখাতে পারে, আর ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত জ্বর হতে পারে। এমন হলে স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলুন।
  • বোঁটা ফেটে গেলে বা রক্ত পড়লে: যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাস্থ্যকর্মীর সাহায্য নিন। UNICEF বলছে, বাড়িতে খাওয়ানোর পর বোঁটায় একটু নিজের দুধ লাগিয়ে রাখতে পারেন।
  • দুধের নালি আটকে ব্যথা হলে বা ম্যাস্টাইটিস (স্তনের প্রদাহ) হলে: স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলুন। UNICEF-এর পরামর্শ: ঠিকমতো মুখ লাগানো, আরও ঘন ঘন খাওয়ানো, ঢিলেঢালা কাপড় পরা, বোঁটার দিকে আলতো করে মালিশ করা আর ব্যথার জায়গায় গরম সেঁক দেওয়া।

সাহায্য কোথায় পাবেন

UNICEF বলছে, বুকের দুধ খাওয়ানো শুধু মায়ের একার কাজ নয়; পরিবারের সাহায্য দরকার। মুখ লাগানো বা দুধ নিয়ে সমস্যায় আপনার কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলুন, বা স্বাস্থ্য বাতায়নে ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করুন।

কখন দেরি না করে হাসপাতালে যাবেন

WHO-র IMCI নির্দেশিকা অনুযায়ী ২ মাসের কম বয়সী শিশুর নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ খুব গুরুতর অসুখের লক্ষণ হতে পারে। এখনই হাসপাতালে নিন:

  • ঠিকমতো খেতে পারছে না।
  • খিঁচুনি হয়েছে।
  • দ্রুত শ্বাস: মিনিটে ৬০ বা বেশি।
  • শ্বাস নেওয়ার সময় বুকের নিচের অংশ জোরে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে।
  • বগলে মাপা তাপমাত্রা ৩৭.৫° সেলসিয়াস বা তার বেশি, অথবা ৩৫.৫° সেলসিয়াসের কম।
  • শুধু নাড়া দিলে নড়ছে, অথবা একেবারেই নড়ছে না।

২ মাস থেকে ৫ বছর বয়সে IMCI অনুযায়ী নিচের যেকোনো একটি সাধারণ বিপদ চিহ্ন থাকলে এখনই হাসপাতালে নিন:

  • শিশু কিছু পান করতে পারছে না, বা বুকের দুধ টানতে পারছে না।
  • যা খায় বা পান করে, সব বমি করে ফেলে দিচ্ছে।
  • খিঁচুনি হচ্ছে, বা হয়েছে।
  • শিশু খুব নিস্তেজ, বা অচেতন।

নবজাতকের আরও বিপদ চিহ্ন: নবজাতকের বিপদ চিহ্ন। জরুরি নম্বর আর পথে কী করবেন: জরুরি অবস্থা।

সাধারণ প্রশ্ন

কি খেলে বুকের দুধ বাড়ে?

UNICEF বলছে, বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের অন্য সবার মতোই সুষম খাবার দরকার, আর সাধারণত খাবারের অভ্যাস বদলানোর প্রয়োজন নেই। ভালোভাবে খাওয়া ও পান করা মায়ের সুস্থ থাকার জন্য দরকার। তবে দুধ কতটা হবে তা মূলত নির্ভর করে শিশু কত ঘন ঘন খায় আর কতটা ভালোভাবে মুখ লাগায় তার ওপর।

মায়ের বুকের দুধ কমে গেলে কী করণীয়?

শিশু যতবার চায় ততবার খাওয়ান (৬ মাসের কম বয়সে অন্তত ২৪ ঘণ্টায় ৮ বার), রাতেও খাওয়ান, আর মুখ ঠিকমতো লাগছে কি না দেখুন। শিশুকে কাছে রাখুন, ত্বকে ত্বক স্পর্শ দিন। দুধ কম মনে হলে স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলুন; UNICEF বলছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা কারণ খুঁজে বের করতে সাহায্য করতে পারেন।

বুকের দুধ না আসার কারণ কী কী?

UNICEF-এর তালিকায় সাধারণ কারণ: দেরিতে বুকের দুধ শুরু করা, ত্বকে ত্বক স্পর্শ কম, ঠিকমতো মুখ না লাগা, ঘড়ি ধরে নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়ানো, অল্প সময় খাওয়ানো, রাতে না খাওয়ানো, কম কম খাওয়ানো, দুশ্চিন্তা আর ক্লান্তি। প্রসবের জটিলতা, অসুস্থতা বা ডায়াবেটিসের কারণেও দুধ আসতে দেরি হতে পারে।

বুকের দুধ বৃদ্ধির জন্য কোন ট্যাবলেট ভালো?

আমরা কোনো ট্যাবলেট, পাউডার বা ওষুধের নাম বলি না; আমাদের সূত্রগুলোতে এমন কোনো পরামর্শ নেই। কোনো ওষুধ খেতে চাইলে আগে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন, আর ডাক্তারকে জানান যে আপনি বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন। প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো ওষুধ খাবেন না।

দুধ কম মনে হলে কি শিশুকে পানি দেব?

না। WHO বলছে, ৬ মাস পর্যন্ত শিশুকে শুধু বুকের দুধ দিন; চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়া অন্য কোনো খাবার বা পানীয়, এমনকি পানিও নয়।

Buker dudh bare ki khele?

বিশেষ কোনো খাবার লাগে না। UNICEF বলছে, সুষম খাবার খান, ভালোভাবে খান ও পান করুন। দুধ বাড়ানোর আসল উপায় হলো শিশুকে ঘন ঘন, দিনে-রাতে (৬ মাসের কম বয়সে ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৮ বার), সঠিকভাবে মুখ লাগিয়ে খাওয়ানো। দুধ কম মনে হলে স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলুন বা ১৬২৬৩-এ ফোন করুন।

এই লেখা শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য, ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শের বিকল্প নয়। সম্পূর্ণ সতর্কতা

সূত্র

  1. UNICEF Parenting – 5 common breastfeeding problems — UNICEF
  2. UNICEF Parenting – 14 myths about breastfeeding — UNICEF
  3. WHO – Infant and young child feeding (fact sheet) — WHO
  4. WHO – Health topic: Breastfeeding — WHO
  5. WHO – Integrated Management of Childhood Illness (IMCI) chart booklet (March 2014) — WHO
  6. DGHS – স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ — DGHS

কোনো তথ্য ভুল বা পুরোনো মনে হলে আমাদের জানান: ভুল জানান